শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০১৭

উন্নয়ন সরকার বনাম রামপাল আন্দোলন

বাংলাদেশের মানুষ এখন এমন এক উন্নয়ন সরকারের অধীনে জীবন যাপন করছে যে, জনগণ উন্নয়ন না চাইলেও সরকার জোর করে দেশ ও জনগণের  উন্নয়ন করতে   ব্যতিব্যস্ত । উন্নয়ন হলে জনগণের খুশী হওয়ার কথা ,কারণ দেশের উন্নয়ন সাথে মানুষের জীবন যাপনের মানোন্নয়নের সম্পর্ক। তবু দেশের বৃহৎ একটা অংশ এমন উন্নয়ন চাচ্ছে না বরং বিরোধিতা করে রাস্তায় নেমেছে। এই বৃহৎ অংশ আবার অন্ধ বিশ্বাসী মানুষ নয়, কারও আনুগত্য বা দালালী  করে অর্থ বিত্ত বানানোর মানুষিকতা সম্পন্ন নয়, এরা যুক্তিবাদী, বিজ্ঞান মনস্ক, সচেতন এবং ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানবতাবাদী মানুষদের অংশ। এদের ডাকে সাড়া দিয়ে জেগে উঠে রাস্তায় নেমেছে  দেশের বৃহৎ তরুণ প্রজন্ম। যে প্রজন্ম কোন টেণ্ডার পাওয়া, বা মিছিল শেষে খিচুড়ি খাওয়ার আশায় এই ডাকে সাড়া দেননি কিংবা ভবিষ্যতে কোন মন্ত্রী,  এম পি হওয়ার পথকে সুগম করার জন্যও সাড়া দেননি। তারা উপলব্ধি ও যুক্তির নিরিখে বুঝতে পেরেছেন সুন্দরবনের নিকটবর্তী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপিত হলে জীব বৈচিত্র্যে ভরপুর ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন হুমকির সম্মুখীন হবে।একজন ব্যক্তির গোঁয়ারতুমিতে  এই বন ধ্বংস হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অভাবনীয় প্রাকৃতিক বিপর্যয় সহ নানামুখী সমস্যার  সম্মুখীন হবে, এই চেতনার জায়গা থেকেই নিজের পকেটের পয়সা ও সময় ব্যয় করে  তারা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে। তাদের আন্দোলন ভাষা ও প্রতিবাদের মাধ্যমগুলো সভ্য,মার্জিত,সুশৃঙ্খল এবং সৃজনশীল। তবুও কেন সরকার একবারের জন্যও এই মানুষগুলোর কথা শোনার প্রয়োজন অনুভব করছে না?
এখানে বুঝতে হবে,  আমরা সাধারণ দৃষ্টিতে উন্নয়ন বলতে যা দেখি বা বুঝি,ক্ষমতাসীনরাও কি একই ভাবে বোঝে? পার্থক্যের বিস্তর ফারাক এখানেই। আমরা উন্নয়ন বলতে সাধারণ মানুষের স্বার্থকে বুঝি। আর ক্ষমতাসীনদের উন্নয়ন হল প্রকল্প বরাদ্দের নামে  কিছু মানুষের মধ্যে  অর্থ ভাগবাটোয়ারা করে বিদেশে পাচার করা। এই জায়গায় বাধা এলে কে ছেড়ে দ্যায়। প্রজাতন্ত্রের সকল শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা তাদের হাতে। প্রয়োজন হলে প্রজাতন্ত্রের বৈধ শক্তিকে অবৈধ ব্যবহার করে হলেও নিজ স্বার্থ উদ্ধার করবে।অবৈধ ও স্বার্থান্বেষীদের চরিত্র এমনই হয়ে থাকে। 
বর্তমান চলমান আন্দোলনকারীদের সাথে আজকের দানবীয় সরকারের মূল দ্বন্দ্ব এখানেই।  

তবে  যুদ্ধাপরাধীর বিচারের ইস্যুতে যে তরুণ প্রজন্মের সমর্থনে আজকের সরকারের  এই দানবীয় রূপ, সেই তরুণ প্রজন্মই জাতিয় স্বার্থে ঘুরে দাঁড়িয়েছে আপনাদের বিপক্ষে, সুতরাং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থার আশীর্বাদে স্থিতিশীল হওয়ার সুবাদে এই উপলব্ধি আজ না হলেও, বাস্তবতা দিয়ে সেই উপলব্ধি করার সময় শুধুই  সময়ের ব্যাপার মাত্র ......।

বুধবার, ৪ জানুয়ারী, ২০১৭

শিক্ষা নিয়ে গড়বো দেশ , শেখ হাসিনার বাংলাদেশ

এবার বাংলাদেশের প্রাথমিক পাঠ্যবই এর মলাটের পেছনে সংযোজিত নতুন দু’লাইনের একটি স্লোগান দেশের বর্তমান প্রকৃত বাস্তবতার ইঙ্গিত ও অনেকগুলো ভাবনার জন্ম দিলো। শ্লোগানটি হল-

শিক্ষা নিয়ে গড়বো দেশ
শেখ হাসিনার বাংলাদেশ।
শ্লোগানটি মূলত হওয়া উচিত ছিলো-
শিক্ষা নিয়ে গড়বো দেশ
আমার এই বাংলাদেশ।
এমন হলে একটি শিশু ভাবতে শিখতো এই দেশ ও এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠী আমার, তাই আমাকে এই রাষ্ট্র ও এই জনগোষ্ঠীকে সঠিকরূপে পরিচালনার জন্য জ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা অর্জন করতে হবে এবং নিজেকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এমন হলে শিশুর মনের মধ্যে তৈরি হতো নেতৃত্ব দানের মানসিকতা।
অথবা শ্লোগানটি যদি এমন হতো-
শিক্ষা নিয়ে গড়বো দেশ
আমাদের এই বাংলাদেশ।
তাহলে একটি শিশুর মধ্যে গড়ে উঠত সামগ্রিক জাতিকে নিয়ে ভাবনার মানসিকতা এবং মনের মধ্যে উদয় হতো- সম্মিলিত চেষ্টা ও অবদানেই গড়ে তোলা সম্ভব সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। আর সেই অবদানে নিজেকে একজন যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে তাকে জ্ঞান অর্জন অত্যাবশ্যক।
আজকের শিশু মূলত আগামী দিনের দেশের কর্ণধার এবং দেশ গড়ার কারিগর। একটি শিশু যে দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার এবং তার হাতেই রাষ্ট্রের আগামী দিনের দায়িত্ব এই বোধটা শিশুদের মধ্যে তৈরি করে দেয়ার মহান দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রের এবং তা রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থেই।
কিন্তু আজ যে স্লোগানটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে, এই স্লোগানটির মাধ্যমে প্রথমেই একটি শিশুর মনে যে ধারণা বা বোধের জন্ম দেবে তা হলো, পড়তে হবে দেশ গড়ার জন্য কিন্তু পড়াশুনা করে যে দেশটি গড়ার দায়িত্ব তাকে নিতে হবে সেই দেশটি তার নয়, দেশটি একজন ব্যক্তি বিশেষের। পড়াশুনা করে মূলত তাকে এই দেশ গড়ার জন্য একজন দক্ষ কর্মচারী হতে হবে, নেতা হওয়া যাবেনা, কারণ দেশের নেতৃত্ব আসবে দেশের মালিকের উত্তরসূরিদের থেকে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণ ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের জন্য কোন ব্যক্তি বিশেষকে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব প্রদান করে থাকেন। জনগণ মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নেতা নির্বাচন করেন, তাকে রাষ্ট্রের মালিকানা প্রদান করেন না। কিন্তু এবারের প্রাথমিক শিক্ষার বইয়ের মলাটের শ্লোগানের সারমর্ম বলে দিচ্ছে, আমাদের দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নয় বরং রাষ্ট্রের মালিকানা সত্ত্ব অর্জন করেছেন। এমন স্লোগানের যৌক্তিকতায় বলা যেতে পারে, যেহেতু আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে জনগণ দায়িত্ব দেননি, দায়িত্ব তিনি নিজে নিয়েছেন এবং তা অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে। পৃথিবীর সমস্ত অবৈধ ক্ষমতাধারীরা সব সময়য় নিজেদের কে রাষ্ট্রের মালিক বা অধিপতি ভাবেন আর জনগণকে তার দাস মনে করেন। আর রাষ্ট্র শক্তির অপব্যবহার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে যাবতীয় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে থাকেন। যা ঐতিহাসিক সত্য। তার বহিঃপ্রকাশ আমরা বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে লক্ষ্য করছি।

দেশটা যে দীর্ঘ মেয়াদি স্বৈরশাসনের কব্জায় পড়েছে তারই সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে বইয়ের মলাটের দুই লাইনের স্লোগানে। একটি শিশুর জীবনের সমাজ নিয়ে ভাবনার প্রথম ধাপেই তার মস্তিষ্কে মধ্যে পরাধীনতার বীজ ঢুকিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, এর ফলে শিশুর মনে অঙ্কুরিত হবে দাস প্রবৃত্তির মানসিকতা, ভবিষ্যতের বেড়ে ওঠা মানুষটির মধ্যে তৈরি হবেনা প্রতিবাদের মানসিকতা, তৈরি হবে বিশেষ কোন মানুষ বা গোষ্ঠীর প্রতি অন্ধ আনুগত্য ও মাথানত করার প্রবৃত্তি।
সাধারণত উন্নত চিন্তাশীল দেশগুলোতে দেখা যায়, যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে দেশ ও জনগণের কল্যাণে ও বৃহত্তর স্বার্থে কোন বিশেষ অবদান রেখে যান তাহলে তাদের দায়িত্ব থেকে বিদায়ের পর পরবর্তী প্রজন্ম অথবা পরবর্তীতে রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিবর্গ তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ নানাভাবে সম্মান প্রদর্শন করেন। অথচ আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে বৃহত্তর জনগণের শ্রদ্ধা বা অশ্রদ্ধা প্রদর্শনকে উপেক্ষা করে ক্ষমতার অপব্যবহার মাধ্যমে আইন করে নিজের জীবদ্দশায় নিজের স্বীকৃতি নিজেই ঘোষণা করে মানসিক আত্মতৃপ্তি লাভ করার সংস্কৃতি। যা হাস্যকর ও রাষ্ট্রের জন্য অকল্যাণকর।

মঙ্গলবার, ১ নভেম্বর, ২০১৬

সুশান্ত পালের বিরুদ্ধে মামলা এবং প্রসঙ্গ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ফেজবুকে কূটক্তি করায় ৩০তম বিসিএসের মাধ্যমে কাস্টমস ক্যাডারে যোগ দেওয়া সরকারি কর্মকর্তা সুশান্ত পালের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে।

তবে আমি এই প্রসঙ্গ ধরে একটু অন্য ভাবে বলার চেষ্টা করছি,.. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের মধ্যে গর্বের ধন হলেও এখন আন্তর্জাতিক ভাবে গর্ব করার মত কিছুই নেই।এখান থেকে পাশ করা কিছু ছাত্র ব্যতিত অধিকাংশ ছাত্রই দেশের বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করার অনুপযুক্ত।এখানে এখন শিক্ষার থেকে ছাত্র শিক্ষকেরা বাংলাদেশের নোংরা রাজনীতি বেশী চর্চা করে। ফলোশ্রুতিতে এক সময়ের প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই বিদ্যাপীঠটিকে বিশ্বের হাজার হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যখন র‍্যাংকিং হয় তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম অসংখ্যের শেষ কাতারেও খুঁজে পাওয়া যায় না।অবকাঠামোগত দিক থেকে সমৃদ্ধ হওয়ার সত্বেও শিক্ষার মানের কারণে এই দুর্দশা। এখান থেকে পড়ে দেশের মধ্যে বিসিএস ক্যাডার বা পিস্তল চালনায় দক্ষতা অর্জন করে দেশের মন্ত্রী হওয়ার মধ্যে গর্বের কিছুই নাইযদিনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করার যোগ্য না হই এবং এখানে থেকে সেই মানের শিক্ষার্থী তৈরী না হয়।এখন দেশের মধ্যে দেশী বিদেশী অনেক প্রতিষ্ঠানের নীতি নির্ধারণই পদের শূন্যতা পূরণ করতে হয় দেশের বাইরে থেকে কর্মকর্তা এনে।দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার্থী বা মানব সম্পদ তৈরী করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে।আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এমন অনেক মানুষের সাক্ষাৎ ঘটেছে যারা যুগোপযোগী শিক্ষা অর্জন করতে না পারায় ব্যক্তি ও কর্ম জীবনে ব্যর্থ হয়ে শুধু এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নের অহংকারে নিজেদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা ও মেধাবী ভেবে থাকেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও সংগ্রামের প্রতীক। আমাদের সম্পদ।এই প্রতিষ্ঠানে যারা অধ্যায়ন করছে এবং করেছেন, এই প্রতিষ্ঠান শুধু তাদেরই ভাবনার বিষয় ও গর্ব করার সম্পদ নয়।এটা সমগ্র দেশের মানুষেরই গর্বের ধন।কারণ এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাফল্যে আমরাও গর্ববোধ করি এবং ব্যর্থতায় আমরাও চিন্তিত হই। তাই গঠনমূলক সমালোচনার অধিকার সবারই রয়েছে এবং সেই সমালোচনায় নিজেকে অসম্মানবোধ না করে, বরং সমালোচনার বাস্তবতা আমলে নিয়ে নিরবে গ্রহণ বা পরিত্যাগ করাই শ্রেয়। তবে এ কথা মানি কারো অবাস্তব বা অমূলক সমালোচনায় এত বড় প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ সময়ের অর্জিত সম্মানের তেমন কিবা ক্ষতি সাধন হতে পারে। 

মঙ্গলবার, ২৫ অক্টোবর, ২০১৬

বৈশাখের আমন্ত্রণে কাতালোনিয়ার রাজধানী বার্সেলোনা ঘুরে এসে (ভ্রমণ কাহিনী)পর্ব -১

ফরাসি সীমানার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছিলাম পাচঁ বছরমাঝে মাঝেই ইচ্ছে হতো এই বৃত্ত অতিক্রম করে ঘুরে আসি সীমানা পাড়ি দিয়ে অন্য কোথাও থেকেকিন্তু সময় অনুকূলে না থাকায় হয়ে উঠছিলো না সেই সুযোগএবার এক সপ্তাহের জন্য পরিবারের সঙ্গে অবকাশ যাপনের পরিকল্পনা ছিলো  ফ্রান্সের বরদু শহরেএর মধ্যে প্যারিসের একজন প্রিয় বন্ধু কামরুল হাসান উজ্জ্বল ভাই ফোনে আমন্ত্রণ জানালেন সপরিবারে স্পেনের বার্সেলোনায় ঘুরতে আসারউপলক্ষ্য অবশ্য আরও একটি রয়েছে, তাহলো বার্সেলোনায় বাংলাদেশ সমিতির আয়োজনে বৈশাখী মেলা উদযাপনের অংশ হওয়াতবে আমার স্ত্রী জান্নাত ও মেয়ে মিশেলের  স্কুলের ব্যস্ততার কারণে ওদের আমার ভ্রমণসঙ্গী হওয়া সম্ভব হলো নাতাই আমি একাই যাওয়ার জন্য মন স্থির করলামতবে প্যারিস থেকে আমন্ত্রিতদের তালিকায় আরো রয়েছেন পুঁথি শিল্পী কাব্য কামরুল দম্পতি ,সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হাসনাত জাহান এবং চিত্র শিল্পী মুহিত জ্যোতিএর মধ্যে মুহিত জ্যোতি বিমান টিকেট বুকিং করেছেন আর বাকিরা যাবেন বাসেবাস ভ্রমন দীর্ঘ হলেও যাত্রাপথের দৃশ্য দেখার আনন্দ নেওয়া যায়তাই আমিও অন্যান্য অতিথিদের সাথে বাসে যাত্রা করার জন্য ২৭ মের একটি টিকেট বুকিং করলামএর ফলে প্যারিস থেকে আমাদের আমন্ত্রিতদের মধ্যে বাসে সফর সঙ্গিদের সংখ্যা দাড়ালো চারজনএরমধ্যে আমাদের ভ্রমণকে উপভোগ্য করার জন্য নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে রামবুতার ফ্লস রেস্তোরায় বসে সবাই এক সন্ধ্যায় একটি ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরি করলামদীর্ঘদিন পর ফরাসি সীমানার বাইরে অন্যকোন দেশ পরিভ্রমণে যাচ্ছি তাই আমার মধ্যে উৎসাহ এবং উদ্দিপনা একটু বেশী অনুভব করছিলামতার উপর ফটোগ্রাফির এক দুর্দান্ত নেশা রয়েছে আমার মধ্যে,নতুন কোন স্থানে গিয়ে নতুন কোন বিষয়ের উপর ফটোগ্রাফির আনন্দটাও একটু ভিন্নরকম হয়, তাই ভ্রমণ উপলক্ষ্য নাইকনের ৫৫-৩০০ মিলিমিটারের একটি ক্যামেরা লেন্সও কিনে ফেললামদীর্ঘ পনের ঘন্টার ভ্রমণ পথ তাই খাদ্য পানীয় সামগ্রির ছোট খাটো একটা মজুদও সঙ্গে রাখতে হলো২৭ মে ভ্রমণ সঙ্গীদের সবাই প্যারিসের ব্যারছি বাস স্টেশনে বিকেল পাঁচটার মধ্যে চলে এলামআমার সীট জানালার পাশে সংরক্ষিত, কিন্তু বাসে প্রবেশ করে দেখি নির্ধারিত সীটটি দখল করে আছে বিশোর্ধ বয়সের হালকা পাতলা গড়নের এক তরুনী পা দুটো সীটের উপর উঠিয়েবসার ভঙ্গী দেখে আর ইচ্ছে হলো না মেয়েটিকে বলি জায়গা পরিবর্তন করতে, তাই পাশেই সীটেই স্থান নিলামআমাদের বাস সারে পাঁচটায় স্পেনের বার্সেলোনা শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলোযাত্রার দিন শুক্রবার হওয়াতে শুরুতেই দীর্ঘক্ষণ জ্যামের সম্মুখিন হতে হলোশনি রবিবার দুইদিন সাপ্তাহিক ছুটির কারণে ফরাসিদের অনেকেই ছুটি কাটাতে ব্যক্তিগত মোটর গাড়ী নিয়ে দূরের কোন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে শুক্রবার অফিস ছুটির পর বেরিয়ে পড়েতাই এই দিনে স্বভাবতই ইল দো  ফন্স এর মধ্যকার মহাসড়কগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত মোটর যান পরিলক্ষিত হয় যাইহোক  প্রায়  দুই ঘন্টার যানজটপূর্ণ দীর্ঘ থেমে চলা পথ পেড়িয়ে আমাদের বাস প্রবেশ করলো সুবুজ মাঠ আর গভীর অরণ্যের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা মুক্তপথেদুই ঘন্টা মনে হচ্ছিলো বাংলাদেশের ঢাকার কোন সড়কে অবস্থান করছিলামবাস বাধাহীন গতিতে এগিয়ে চলতে লাগলো  অন্যান্য যাত্রীদের মধ্যেও এক  প্রাণচাঞ্চল্যতা পরিলক্ষিত হলোকেউ বই পড়া,কেউ ট্যাবলেট ল্যাপটপে সিনেমা দেখা , গান শোনায় মেতে উঠলো ,কেউবা আবার আয়েশী ঘুমের দোলায় দোল খেতে লাগলোকিন্তু জানালার বাইরের দৃশ্য আমাকে এক মোহনীয় ভালোলাগায় আচ্ছন্ন করে ফেললোদীর্ঘ দিনের ইট পাথর আর কংক্রিটের আবাস ভূমি থেকে বেরিয়ে সবুজের মধ্যে প্রবেশ করে তৃষ্ণার্ত চোখ পিপাশা মেটাতে যেন ব্যাকুল হয়ে উঠলোউঁচু নিচু ধু ধু ফসলী জমি,মাঠের মাঝে গড়ে ওঠা এক চিলতে ফরাসি গ্রাম, হঠাৎ ধবল ধেনুর পাল ও ভেড়ার আপন মনে ঘাস খাওয়ার দৃশ্য যেন আমাকে বাংলাদেশের স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলোকানে বেজে চলছিলো এম পি ফোরে মেহেদী হাসানের মিথিলা এ্যালবামের কবিতাগুলোএক অন্যরকম ভালোলাগার ঘোরের মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছিছিলাম ,এভাবে দীর্ঘ পথ অতিক্রমের এক পর্যায়ে  হঠাৎ বাস থেমে গেলো , বাসে প্রবেশ করলো সন্দেহাতীত দৃষ্টিতে দুই ফরাসি পুলিশ, সাথে দীর্ঘদেহী এক গোয়েন্দা কুকুর,উদ্দেশ্য কোন দুস্কৃতিকারী বা বিস্ফোরক দ্রব্য খোঁজাকোন কিছু না পেয়ে পুলিশ ও কুকুর বিদায় নিলো আবার যাত্রা শুরু করলো বাসশুশৃংখল বনবাদার আর পাহাড়ী পথ অতিক্রম করতে করতে আটটার দিক থেকে গোধুলী আলোয় প্রকৃতি  ধূসর হতে লাগলোউচু নিচু টিলার মধ্যে ফসলী জমির পাশ দিয়ে গড়ে ওঠা পশুর খামারে সাদা শুকুর আর ধবল ভেড়ার পাল ক্লান্ত দেহে বিশ্রাম নিচ্ছেআধো আলো অন্ধকারে মনে হচ্ছিলো মাঠের মধ্যে সাদা গোলক আকৃতির কোন বস্তু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছেসন্ধ্যে নামার একটু আগে, নয় টার দিকে আমাদের বাস ত্রিরিস মিনিটের একটা বিরতি নিলো মহাসড়কের (অটোরুত autoroute)এর পাশে সুবিশাল পাহাড়ের কোল ঘেষে অবস্থিত একটি রেস্তোরায়মহাসড়কের পাশে ধরনের রেস্তোরাগুলো মূলত গড়ে তোলা হয়েছে যাত্রীদের সুবিধার্থেকারণ দীর্ঘ যাত্রায় যাত্রীরা বিরতিতে এখান থেকে তাদের ক্ষুধা নিবারণের কাজটি সেরে নিতে পারেন এবং রিফ্রেসমেন্টের পাশাপাশী প্রয়োজনীয় পানীয় দ্রব্য খাবার সংগ্রহ করতে পারেনফরাসিতে এই ধরনের যাত্রাবিরতির জায়গাকে এ্যার(aire)বলা হয়  আমাদের ভ্রমনসঙ্গীদের চারজন সঙ্গে আনা খাবার দিয়ে রেস্তোরার বাইরে তেরাসে(terrasse)বসে এক সঙ্গে ডিনার সেরে নিলামখাবার গ্রহণের পাশাপাশী প্রকৃতি ভ্রমণ নিয়ে আমাদের মধ্যে টোট্ট একটা আড্ডাও হয়ে-গেলোকাব্য কামরুল  ভ্রমণ প্রিয় মানুষ,ভ্রমণ সংক্রান্ত পড়াশোনাও রয়েছে তারউনি একজন বিখ্যাত ভ্রমণ বিষয়ক লেখকের উদ্ধৃতি দিয়ে বললেন,কোথাও ভ্রমণে গেলে স্থানের সঙ্গে আপনার ভালোলাগা অন্যকোন দেশ বা স্থানের তুলনা করা সমীচীন নয়, কারণ প্রতিটি অঞ্চলের ভিন্নতা গড়ে ওঠে তার নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য,রাজনীতি,শিল্প সংস্কৃতি ও প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যে ঐ অঞ্চলের মানুষের জীবনধারার উপরআর ভ্রমণে মজাই হচ্ছে এই ভিন্নতার স্বাদ নেওয়াতুলনামূলক বিচারে গেলে নতুনত্বের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হতে হয়এর মধ্যে উঠে এলো বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত গানে কথার প্রসঙ্গে কিছু কথা « এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি »আমরা এতক্ষণ এত সবুজ,এত সাজানো মাঠ ঘাট পাহাড় প্রান্তর পেরিয়ে আসার পর মনে হলো এই গানের কথাগুলো সত্য নয় তবে কথাগুলো কবির গভীর দেশপ্রেমের একান্ত আবেগের বহিঃপ্রকাশপ্রতি দেশের সৌন্দর্যের ভিন্নতা রয়েছে, সেই সৌন্দর্য সরাসরি চোখ মেলে দেখে তুলনা করার সৌভাগ্য এক জীবনে একজন মানুষের হয়ে ওঠেনা , তাই নিজের দেশ বা বৃত্তের মধ্যে চোখে দেখা প্রকৃতির প্রেমে মগ্ন হয়ে তার বাস ভূমিকে পৃথিবীর সেরা মনে হয়, সকল দেশের রানী মনে হয়এই মনে হওয়াটা হচ্ছে মাতৃভূমির প্রতি মমত্ব ও ভালোবাসার উপলব্ধি অন্যকোন দেশের সৌন্দর্যকে ছোট করা নয়। 

 বাস আবার যাত্রা শুরু করলো ,কিছুক্ষণ সন্ধ্যের গোধুলী আলোয় দূরের মাঠ ও পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে মেঘের ভেসে বেড়ানোর দৃশ্য দেখে চমকিত হচ্ছিলাম ধীরে ধীরে প্রকৃতিতে নেমে আসতে লাগলো  ঘোর অন্ধকার শুধু বাসের হেড লাইটের আলোয় বাসের সামনের এগিয়ে চলার দৃশ্য দেখা যায় ,জানালার পাশের দৃশ্যগুলো মাঝে মাঝে ল্যামপোষ্টের আলোয় এক ঝলক কিছুটা ঝাপসা দেখা গেলেও দূরের দৃশ্যে কোন গ্রাম বা স্থাপনার বিজলী বাতির আলোর বিচ্ছুরণ ছাড়া কিছুই চোখে ধরছিলোনাএর মধ্যে শুরু হলো বৃষ্টির প্রবল বর্ষণ,এমন ঝুম বৃষ্টি প্যারিসে কখনো দেখা হয়নি,চলন্ত বাসের ছাদে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে শরীরে এক দারুন শিহরণ অনুভব করলাম,মনে হলো দেহ মন কিছুক্ষণের জন্য অবস্থান করছে আষাঢ়ের দিনে গ্রাম বাংলার কোন টিনের চালা ঘরে। 

রাত রারোটার দিকে আমরা পৌঁছুলাম ফ্রান্সের লিঁও শহরেএখানে বাস পনেরো মিনিটের রিরতিতে প্যারিস থেকে আগত লিঁও শহরের যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে বার্সেলোনা গামী  যাত্রী তুলে নিয়ে যাত্রা শুরু করলোশহরের মধ্য দিয়ে যাত্রা-কালীন সময়ে রঙিন আলোয় দেখা হলো মধ্য রাতের শান্ত স্নিগ্ধ লিঁও শহরের কিছুটা অবয়ববাসের যাত্রীদের অনেকেই জানালার পর্দা টেনে ঘুমিয়ে পড়েছেলিঁও থেকে আমার সহযাত্রীনী পরিবর্তন হয়ে আমার পাশের ছিটে অবস্থান নিয়েছে নতুন সহযাত্রীনীসেও বাস চলার কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমের ঘোরে চলে গেলো কিন্তু আমার চোখে ঘুম নেইনিস্তব্ধ রাতের শান্ত প্রকৃতির মধ্যদিয়ে অবিরাম ছুটে চলছে বাসচোখে কখনো তন্দ্রা এসে ভর করছে, আবার চলে যাচ্ছেআধো ঘুম আধো জাগরণের দোলায় দুলতে দুলতে রাত সারে তিনটায়  এসে পৌছুলাম ফ্রান্সের নিম শহরেবাসের ক্যাপ্টেন(এখানে এধরনের দূরবর্তী যাত্রীবাহী বাসের ড্রাইভারদেরকে ফরাসি ভাষায় কাপিতান বলা হয়)ঘোষনা করলেন, এর পর বাস ফরাসি সীমানার মধ্য আর বিরতি না নিয়ে সরাসরি স্পেন চলে যাবে এবং বাসের মধ্যকার ওয়াশ রুম বন্ধ থাকবে, তাই এখান থেকে সবাইকে ফ্রেস হয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিলেনএখানকার একটি পেট্রোল ষ্টেশনে বাস ত্রিশ মিনিটের বিরতি নিলোঅনেকেই বাস থেকে নেমে ফ্রেস হয়ে খাওয়া দাওয়া করতে লাগলোআমাদের গ্রুপের সবাই সঙ্গে আনা খাবার শেয়ার করে খেলামনিম শহরের কথা ভেবে কাব্য ভাইয়ের হঠাৎ মনে পড়লো ,এই শহরেইতো আবৃত্তি শিল্পী ও লেখক রবি শংকর মৈত্রী স্বপরিবারে বসবাস করেন উনি একবার ফোন করে রবি দাকে বলতে চাইলেন ,আমরা এখন আপনার শহরে অবস্থান করছি কিন্তু গভীর রাতের  কথা ভেবে আবার বিরত রইলেন ফোন করা থেকে। 

এখান থেকে যাত্রার পর কখন যে গভীর ঘুমে চলেগিয়েছি বুঝতে পারিনিসকাল সাতটার দিকে বাসের ক্যাপ্টেনের ঘোষনায় ঘুম ভেঙ্গে গেলোচোখে পাতা উল্টোতেই জানালার ভেদ করে  দেখা মিললো সুবিশাল জংলা পাহাড়,পাহাড়ী ভূমিটা দেখতে অনেকটা ভয়ংকর রকমেরবাস আবার একটা এ্যর(aire) পনেরো মিনিটের বিরতি নিলোবুঝতে পারলাম এখন স্পেনের ভূমিতে অবস্থান করছিবাস যখন তার নির্দিষ্ট গন্তব্য বার্সেলোনার দিকে যাত্রা শুরু করলো তখন ফ্রান্সের সাথে স্পেনের ভূপ্রকৃতি,বাসস্থান,স্থাপনার পার্থক্যগুলো পরিলক্ষিত হতে লাগলোযখন শহরের মধ্যে প্রবেশ করলাম তখন ঢাকা শহরের সাদৃশ্য খুজে পেতে লাগলামবিল্ডিং,ওভারব্রিজ,বিলবোর্ড,ব্যস্ত সড়কের এত বেশী সাদৃশ্য দেখে মনে হলো, আমি হয়তো দীর্ঘ পাঁচ বছর পর আমার সুপরিচিত ঢাকা শহরে ফিরে এসেছিআটটা পনেরো মিনিটে আমাদের যাত্রীবাহী য়ুইবুছ(ouibus)দীর্ঘ পনেরো ঘন্টার যাত্রার যবনিকা টানলেন বার্সেলোনার বাস টারমিলালেবাস থেকে নামতেই আমাদের জন্য অপেক্ষমান দৃষ্টিতে দাঁড়ানো উজ্জ্বল ভাইয়ের সাথে দেখাসেই চিরচেনা হাস্যজ্জল মুখে আমাদেরকে অভিবাদন জানিয়ে মেট্র ষ্টেশনে নিয়ে গেলেন। 

আর্ক দো ত্রিওফ মেট্র ষ্টেশন থেকে পাতাল ট্রেনে আমরা নামলাম প্লাস দো কাতালোনিয়ায়কিছুটা পথ হাটতে হলোউজ্জ্বল ভাই শহরের কিছু নিয়ম কানুন সম্পর্কে ব্যাখা করতে লাগলেনট্রাফিক সিগন্যাল সম্পর্কে প্যারিসের সঙ্গে এই শহরের পার্থক্য বুঝিয়ে দিলেনপ্যারিসে ট্রাফিক সিগন্যালের সবুজ বাতি নেভার পরও পথচারী রাস্তা পারাপারের কিছুটা সময় পান কিন্তু বার্সেলোনায় সবুজ বাতি নেভার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ী চলাচল শুরু হয়ে যায় সুতরাং অভ্যাসবসত আমরা যেন এখানে সবুজ বাতি নেভার পর রাস্তা পারাপার না হই ব্যাপারে আমাদের প্রথমেই সতর্ক করলেনযে এলাকা দিয়ে উজ্জ্বল ভাই আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছিলো সেই এলাকার বিল্ডিং,ওলিগলিগুলো সম্পূর্ণ আমাদের পুরান ঢাকার মতআমার কিছুতেই মনে হচ্ছিলোনা আমি ইউরোপের কোন আধুনিক শহরে প্রবেশ করেছিপুরাতন স্থাপত্যশৈলির দালানগুলোর প্রতিটি ফ্লাটের বেলকুনিগুলোতে কাঁচা কাপড় শুকোতে দেওয়া হয়েছে,যা অসংখ্যসাধারণত প্যারিসে এমন দৃশ্য দেখা যায়না তাই একটু হোঁচট খেলামছোট ছোট ওলিগোলির মধ্যদিয়ে দু একজন ফেরিওলারও দেখা মিললোপ্যারিসের মত এখানেও ইউরোপিও ইতিহ্যবাহী রুটি কেকের দোকান রয়েছে,ময়দার তৈরির নানা প্রকার খাদ্য সামগ্রির  আকৃতিগত নান্দনিকতার মিল থাকলেও স্বাদের তারতম্য রয়েছেফ্রান্সে এমন খাবারের দোকানগুলোকে বলা হয় বুলোনজারিএমন একটি খাবারের দোকান থেকে উজ্জ্বল ভাই আমাদের সকালের নাস্তার জন্য কিছু বাহারি স্বাদ ও আকৃতির খারার কিনলেনপ্লাসা মাগবা পাশেই এমন একটি এলাকাতে উজ্জ্বল ভাই প্যারিসের পাশাপাশী এখানে ছোট্ট এক নীড় বেধেছেনসেই নীড়ে গত পাঁচ মাস আগে ছোট্ট এক অথিতির আগমন ঘটেছে,তার নাম রাখা হয়েছে উজ্জ্বল ভাইয়ের শাশুড়ি অর্থাৎ লুনা ভাবির মায়ের মায়ের নাম অনুসারেআঞ্জুআঞ্জু বড় বোন ফিরোজা,বয়সে আন্জু দের বছরের বড়ফিরোজার নাম রাখা হয়ছে উজ্জ্বল ভাইয়ের মায়ের নাম অনুসারেনাম রাখার এই অভিনব কৌশলের মাধ্যমে তাদের দুই মায়ের স্মৃতির বন্ধনকে অটুট রাখার প্রয়াস চালানো হয়েছেপিটাপিটি দু বোনের হাসিখুশি খেলাধুলা আর উজ্জ্বল ভাই লুনা ভাবির আদর ভালোবাসায় ভরপুর ছোট্ট বাসাটি যেন একটুকরো স্বর্গসেই স্বর্গে প্রবেশ করতে এক আনন্দের বন্যা বয়ে গেলোঅনেক দিন পর অতি পরিচিত আপন মুখগুলো একসাথে দেখে সবার মধ্যে পুলক অনুবভ হলোরাতভর যাত্রার ক্লান্তি সবার চেহারায় ফুটে উঠেছে,সবাই গোছল সকালের নাস্তা সেরে নেয়ার পর কিছু সময় রেষ্ট নিয়ে  বেরিয়ে পড়লাম উজ্জ্বল ভাইয়ের নির্দেশনায় বার্সেলোনা শহর পরিভ্রমনে, সঙ্গে দুই ক্ষুদে পর্যটক আঞ্জু ফিরোজাপ্রথমেই আমরা গেলাম প্লাস দো কাতালোনিয়াএখানে দেখা মিললো শত শত কবুতর আর পর্যটকের এক অন্য রকম মিলন মেলাপর্যটকদের সাথে এখানকার কবুতরগুলোর দারুন এক বন্ধুত্বের সম্পর্ককিছু গমের দানা হাতে নিয়ে ওদের আহব্বান জানানোর সঙ্গে সঙ্গে কাছে চলে আসে,হাতের উপর ঘাড়ের উপর বসেকবুতরগুলোকে আতিথেয়তার জন্য এখান থেকেই এক ইউরোর বিনিময়ে ছোট প্যাকেটের গমের দানা কিনতে পাওয়া যায়আমরাও কিছু গমের দানা সংগ্রহ করে কবুতরগুলোর সাথে সবাই কিছু সুন্দর সময় উপভোগ করলাম

এই প্লাস দো কাতালোনিয়া মূলত বার্সেলোনা শহরের কেন্দ্রস্থলপর্যটকদের পাশাপাশী স্থানীয় কাতালান স্পানিশদেন দারুন এক আড্ডা স্থলও বটেস্পেনের কাতালান অঙ্গরাজ্যের নাম অনুসারে এই বিখ্যাত চত্বরটির নামকরন প্লাস দো কাতালনিয়াআর কাতালোনিয়া হচ্ছে স্পেনের একটি স্বায়ত্বশাসিত অঙ্গরাজ্যএটি চারটি প্রদেশ বার্সেলোনা, গিরোনা, লেইদা এবং তারাগোনা নিয়ে গঠিত এই অঙ্গরাজ্যের রাজধানী এবং সর্ববৃহৎ শহর হচ্ছে বার্সেলোনা, যা মাদ্রিদের পর স্পেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। কাতালোনিয়ার আয়তন ৩২,১১৪ বর্গ কিলোমিটার এবং এর জনসংখ্যা ৭,৫৩৫,২৫১।রাজ্যটির জনগন বর্তমান স্পেন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নে আন্দোলনরত রয়েছে। 

  প্লাস দো কাতালোনিয়ার পর আমরা এর আশেপাশের এলাকাগুলো হেঁটে দেখতে লাগলামপুরান ঢাকার সাঁখারি বাজারের সাথে বেশ মিল খুজে পেলামসাঁখারি বাজারে যেমন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূঁজা অর্চনার নানাবিধ সরঞ্জাম বিক্রয়ের দোকান রয়েছে, তেমনি এখানে দেখা মিললো সেরকম কয়েকটি দোকান, তবে সেখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূঁজা অর্চনার কোন কিছু বিক্রয় হয়না ,বিক্রয় হয় খ্রীষ্ট ধর্মাবলম্বীদের নবী যীশু খ্রীষ্ট ও মাতা মারিয়ুম এর মূর্তি,বাইবেল এবং খ্রীষ্ট ধর্ম সংক্রান্ত বই ইত্যাদি। 

হাসনাত আপা কিছু সুভেনির কেনার ইচ্ছে পোষন করলেন তাই উ্জ্জ্বল ভাই আমাদের নিয়ে গেলেন আশেপাশের একটি পরিচিত বাঙ্গালী মালিকের সুভেনিরের দোকানেদোকানটি অনেক বড় এবং সাজানো গোছানো বার্সেলোনা শহরে এত সুন্দর একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক একজন বাংলাদেশী ভেবে গর্ববোধ হলোউজ্জ্বল ভাই সবাইকে দোকানের স্বত্বাধিকারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেনভদ্র লোকের নাম উত্তম কুমার, বাংলাদেশের ফেনি জেলায় তার পৈতিক নিবাসনব্বই দশকে ফ্রান্সের প্যারিসে পারি জমালেও পরবর্তিতে স্পেনের এই বার্সেলোনা শহরে থিতু হয়েছেনঅত্যন্ত বিনয়ী স্বভাবের সাংস্কৃতিক মনা মানুষটি স্বপরিবারের এখানে বসবাস করছেনআমরা যে বাংলাদেশ সমিতির আয়োজনে বৈশাখী মেলা উপলক্ষ্যে এখানে এসেছি, উত্তম কুমার সেই বাংলাদেশ সমিতি বার্সেলোনার সাধারণ সম্পাদকহাসনাত আপা ওনার দোকান থেকে ক্রয় করার জন্য যে সুভেনিরগুলো সংগ্রহ করলেন কিন্তু মূল্য দিতে গিয়ে শত চেষ্টা করেও তা সম্ভব হলোনাআমাদের অন্যাদেরকেও একটি করে সুভেনির উপহার দিলেনহঠাৎ দোকানের দেয়ালের এক পাশে ছেঁটে দেয়া একটি পোষ্টারে নজর পড়লো২৯ মে অনুষ্ঠিতব্য বৈশাখী মেলার পোষ্টার ,পোষ্টারটি চারজন গুনি অতিথি শিল্পী ফকির শাহাবুদ্দিন,তপন চৌধুরী,পবন দাস বাউল আমাদের কাব্য কামরুলের ছবি সম্বলিতভালোলাগলো পোষ্টারে কাব্য কামরুলের ছবি দেখে। 

উত্তম দা কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা রওনা হলাম সাগর পারের উদ্দেশ্যেপ্লাসা দো কাতালোনিয়া থেকে সহজ পথ  লা রামলা দিয়ে আমরা সাগরের দিকে হাঁটতে শুরু করলামপর্যটকদের শ্রোতে লা রামলা প্রশস্থ পথটি যেন একটি দীর্ঘ মৌন মিছিলের রূপ নিয়েছেউজ্জ্বল ভাই প্রথমেই লা রামলার পাশেই অবস্থিত বার্সেলোনার একটি ঐতিহ্যবাহী বাজারমার্কা সেন্ট যোসেফ লা বুকারিয়া’ (Mercat St. Josef La Boqueria)তে নিয়ে গেলেনকয়েক শত বছরের  প্রাচীন এই বাজারটিতে যতটানা ক্রেতার ভীড় রয়েছে তার চেয়ে দ্বিগুন রয়েছে দর্শনার্থীদের হুড়োহুড়িবাজারটির ধরণ আমাদের দেশের কাওরান বাজারের মত কিন্তু অত বড় নয়এই ছোট্ট বাজারটিতে মাছ,মাংশ,ফলমূল,শাক সবজি,রেস্তোরার খাবার সবই পাওয়া যায়আমাদের দেশের বাজারগুলো থেকে পার্থক্য এই যে,বাজারটি চকচকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং প্রতিটি দোকানের পন্য সামগ্রী এমন বৈচিত্র শৈল্পিকভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে প্রদর্শিত যা যে কোন মানুষকেই আকৃষ্ট করবেশৌখিন আলোকচিত্রিরাও তাই এই ব্যতিক্রমধর্মী দোকানগুলোর ছবি তুলতে সদা ব্যস্তলা বুকারিয়া থেকে বেড়িয়ে আমরা আবার মিরাদোর দো কলম(Mirador de colom)দিকে হাঁটতে লাগলামলা রামলার ব্যস্ত লোকারণ্য পথটির দুই ধার দিয়ে সুসজ্জিত সুভেনিরের দোকান, চিত্র শিল্পীদের চিত্রকর্মে ব্যস্ততা,পথ শিল্পীদের নাবিক কলম্বাস,বিখ্যাত স্থপতি গাউদির মূর্তি সেজে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার দৃশ্যগুলো যেন জায়গাটিকে এক ভিন্নতর সৌন্দর্য দিয়েছেএই সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে কাব্য ভাই কয়েকবার আমাদের মাঝ থেকে পর্যটকদের ভিড়ে হারিয়ে গেলেনআমিও ছবি তুলতে গিয়ে গ্রুপ থেকে মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন হতে লাগলাম
প্রচন্ড রোদ আর রাতভর দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি সবার মধ্যে ভর করে বসলো , তাই মিরাদোর দো কলম আসার পর কেউ আর সামনে এগুতে ইচ্ছে পোষন করলো নাসবাই এই বন্দরের গাছের নিচে জল খাবার নিয়ে বসে পড়লামআমাদের ক্ষুদে ভ্রমণার্থী আঞ্জু আর ফিরোজাও এখানে দুপুরের খাওয়া সেরে নিলোগল্প গুজবের ফাঁকে আমাদের পুঁথি শিল্পী কাব্য ভাই বার্সেলোনা শহর নিয়ে একটি পুঁথিও রচনা করে ফেললেন তাৎক্ষনিক রচিত সেই পুঁথি আবার পোর্ট ভেল বন্দর পাড়ে উজ্জ্বল ভাইয়ের নির্দেশনায় মোবাইল ক্যামেরায় শ্যুট করা হলোব্যতিক্রম সুরের এই পরিবেশনা দেখে কিছু সাদা চামড়ার মানুষ উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেনসঙ্গে সঙ্গে এই বন্দর পাড় থেকে বার্সেলোনা বন্দনার এই পুঁথির ভিডিওটি ফেজবুকে আপলোড করে বার্সেলোনা প্রবাসি বাঙ্গালীদের জানিয়ে দেওয়া হলো পুঁথি শিল্পী কাব্য কামরুলের আগমন বার্তা। 

মিরাদোর কলম , এই বন্দর থেকেই নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস প্রথম  আবিস্কারের  উদ্দেশ্যে সমুদ্র যাত্রা করেনএখানে রয়েছে নাবিক কলম্বাসের স্মৃতিসম্বলিত যাদুঘর কলম মুজে মারিতিম(COLOM MUSEU MARITIM)। 

 মিরাদোর কলমে বিরতির পর  মল দোলা ফুজতা(Moll de la Fusta)দিয়ে সমুদ্র সৈকতের দিকে যাওয়ার সময় সুসজ্জিত সারি সারি পাম গাছ দেখে মনে হলো আমরা যেন কোন এক মরূদ্যানের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলছিপাশেই বন্দরে নোঙ্গর করা ছোট বড় জাহাজগুলো ভূমধ্যসাগরের বুকে ভেসে বেড়াতে অপেক্ষমানবন্দর পার দিয়ে আফ্রিকান কালো মানুষদের বার্সেলোনা ক্লাবের সেরা তারকা মেসি নেইমারদের জার্সি,সানগ্লাসের ভ্রাম্যমান দোকানগুলোর কোলাহলপূর্ণ পরিবেশের ভেতর দিয়ে  ক্যাপ দো বার্সেলোনায় আসার পর একটি রেস্তোরায় উজ্জ্বল ভাইয়ের আতিথেয়তায় আমাদের মধ্যাণ্হ ভোজের পর্ব শেষ হলোখারার মেন্যুতে ছিলো আমার পছন্দের তার্কিশ কাবাব , যা প্যারিসে অনেক খেয়েছি কিন্তু বার্সেলোনায় এসে পেলাম একই খাবারের অতুলনীয় ব্যতিক্রম স্বাদ এবং পরিবেশনের মধ্যেও রয়েছে ভিন্নতার ছোঁয়া।  

আমরা এখান থেকে একটি আবাসিক এলাকার মধ্যদিয়ে হেঁটে সমুদ্র সৈকতে যাওয়ার সময় চোখে মিললো প্রতিটি বিল্ডিংয়ের বেলকুনিগুলোতে বার্সেলোনা ফুটবল ক্লাব ও কাতালোনিয়া অঙ্গ রাজ্যের বৈজয়ন্তী টাঙ্গানোএ থেকেই মনে হলো এই শহরের মানুষের ফুটবল নিয়ে রয়েছে অফুরন্ত উচ্ছাস উন্মাদনা এবং ভালোবাসা,আর কাতালানদের ভবিষ্যৎ স্বাধীন কাতালোনিয়া রাষ্ট্র নিয়ে যে স্বপ্নের লালন চলছে এই পতাকাগুলো জানিয়ে দিলো তারই প্রতি অসীম মমত্বের বহিঃপ্রকাশ।   

লা বার্সেলোনতা সমুদ্র  সৈকতটি পর্যটকদের সামগ্রীক সুবিধার কথা চিন্তা করে স্থানীয় প্রশাসন সু-পরিকল্পিতভাবে সাজিয়ে রেখেছেসাগর পারের বেলাভূমিতে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসা শত শত নারী পুরুষ এবং শিশু কিশোরদের নানাবিধ কর্মকান্ডে যেন সৈকতটি  এক পর্যটক মেলায় পরিণত হয়েছেকেও স্বল্প বসনে প্রখর রোদ্রের মধ্যে শুয়ে আছে,কেউ ব্যায়াময়ের সরঞ্জাম দিয়ে সাজানো স্থানে ব্যায়াম করছে,কেউ সাগর জলে শরীর ভেজাচ্ছে, কেউবা ছুটোছুটিতে মগ্নদূরে বিশাল জলরাশির মধ্যদিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে নানা আকৃতির ছোট বড় পর্যটন জাহাজপোষাকের প্রস্তুতি না থাকায় আমাদের মধ্যে কেউই সৈকতের বেলা ভূমিতে হেঁটে বেড়ানো বা ভূমধ্যসাগরের জল ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে পোষন করলোনাসাগর পারের বিশ্রাম চেয়ারে গল্প করেই আমাদের অধিকাংশ সময় কাটলোসৈকতের পার দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে নানা স্থাপনা ,সড়ক ,সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য দাড়িয়ে আছে সারি সারি পাম গাছ ,গাছগুলোর পাশ তৈরি করা হয়েছে আরো একটি ছোট্ট পরিসরের রাস্তা তা শুধুই সাইকেল আরোহীদের জন্য ,সেই রাস্তা দিয়ে সাগরের উন্মুক্ত হাওয়া গায়ে লাগিয়ে ক্রমাগত ছুটে চলছে নানা আকৃতির দ্বিচক্রযান চালিত শত শত আরোহীস্পেনের বার্সেলোনা একটি সাইকেল বান্ধব শহর।শুধু এই সমুদ্র পারেই নয় ,এই শহরের আনাচে কানাচে এমন সাইকেল চালানোর দৃশ্য সব সময় দেখা মেলে।তবে অধিকাংশ সাইকেলগুলোই  ব্যক্তিগত নয়, এগুলো বিভিন্ন সাইকেল ভাড়া প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হয়এই সাইকেলগুলো চালাতে হলে মাসিক বা বাৎসরিক চাঁদার বিনিময়ে সদস্য হতে হয়।সদস্য হলে তারা একটি ইলেকট্রনিক্স কার্ড দেয় ।এই কার্ড দিয়ে ইচ্ছে মত যে কোনো গ্যারেজের ছোট্ট খুটির সাথে লক করা সাইকেলগুলো থেকে কার্ড পাঞ্চ করে একটি সাইকেল তুলে ইচ্ছে মত চালোনো যায়,আবার অন্য যে কোন গ্যারেজে রেখে দেওয়া যায়।

  আমাদের ক্ষুদে ভ্রমণসঙ্গী আঞ্জু তিনমাস আগে এই সাগর পারের ডেল মার হসপিটালে জন্মগ্রহন করেছেহসপিটাল সম্পর্কে  আলোচনা করতে উজ্জ্বল ভাই জানালো এখানকার  চিকিৎসা ব্যবস্থার এক ব্যতিক্রমধর্মী কৌশলের কথাএখানকার চিকিৎসকেরা শুধু চিকিৎসা বিদ্যা দিয়ে মুমূর্ষু রোগীর শরীরের অঙ্গ প্রতঙ্গের চিকিৎসাই করেনা ,স্বপ্রণদিত হয়ে রোগাক্রান্ত মানুসিক ভাবে ভেঙ্গেপরা মানুষদের মনের উৎফুল্লতার দায়িত্বও নিয়ে থাকেনতাই হসপিটালের চিকিৎসক সেবিকারা যখন রোগী পরিদর্শনে বের হয় তখন তাদের পেশাগত পোষাকের পাশাপাশি মাঝে মাঝে রোগীর সামনে বৈচিত্রময় কমেডিয়ান পোষাক পড়ে হাজির হন এবং রোগীকে চমকে দিয়ে দুঃচিন্তাগ্রন্থ মনকে প্রফুল্লতায় ভরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেনবিষয়টি জেনে আশ্চর্য হলাম এবং ভালো লাগলো রোগীর প্রতি চিকিৎসকদের এমন মমত্ব ভালোবাসা প্রকাশের ব্যতিক্রম উদ্ভাবনে। 

আমাদের সবার শরীর বিশ্রামের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে, তাই আজ আর অন্য কোথাও ঘোরার ইচ্ছে হলোনাসৈকত থেকে আমরা বাসে চলে এলাম প্লাসা ম্যাকবা অর্থাৎ উজ্জ্বল ভাইয়ের বাসার এলাকাতেএখানে পরিচয় হলো বৈশাখী মেলা আয়োজকদের অন্যতম সাংগঠনিক ব্যক্তিত্ব শফিক খানের সাথেতিনিও এক সময় প্যারিসে থাকতেন কিন্তু পরবর্তীতে এই সাগর পারের শহরে থিতু হয়েছেনএখানে একটি বাঙ্গালী টেইলার্সের দোকানে কয়েকজন স্থানীয় প্রবাসী বাঙ্গালীদের সাথে পরিচয় হলোকেউ একজন আমাদের জন্য মুঠোফোনে চায়ের অর্ডার করলেন ,কিছুক্ষণের মধ্যে এক বাঙ্গালী প্রবাসী ভাই চায়ের কেটলি নিয়ে হাজির হলেন ,চায়ের স্বাদ পুরোপুরি বাংলার গ্রাম্য হাঁট বাজারের ঝুপড়ী চায়ের দোকানের খাঁটি দুধের চায়ের মতকিন্তু এই চা বিক্রেতা ভাইয়ের এখানে কোন স্থায়ী চায়ের দোকান নেইপ্লাসা মাগবার আসে পাশে মূলত আমাদের দক্ষিন এশিয়া অন্যদের দেশের প্রবাসীদের বসবাসপরিবেশটাও গড়ে উঠেছে আমাদের অঞ্চলের দেশগুলোর মতরয়েছে অসংখ্য বাংলাদেশী ,পাকিস্থানী এবং ইন্ডিয়ানদের দোকানপাটএইসব দোকানগুলোতে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে প্রবাসীদের আড্ডা ,সেই আড্ডায় খোশ গল্পগুজবের পাশাপাশী চলে চা চক্রএই আড্ডা স্থলগুলো থেকে চা বিক্রেতা ভাইকে ফোন করা মাত্র তিনি চায়ের কেটলি হাতে হাজির হয়ে চা পরিবেশনের মাধ্যমে  আড্ডাকে আরো প্রাণবন্ত করতে ভূমিকা রেখে থাকেনআর এটাই তার সুদূর প্রবাসের জীবন জীবীকা। 

এখান থেকে আমরা চলে গেলাম বৈশাখী মেলার প্রস্তুতি মহড়া স্থলেদেখা হলো আমাদের প্যারিসের প্রিয়,পরিচিত ও সদা হাস্যজ্জল মুখ চিত্রশিল্পী মুহিদ জ্যেতির সাথেবৈশাখী আয়োজনের নানা প্রকার শিল্পকর্ম সৃষ্টিতে খুব ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনিকাজের ফাকে অনেক রমনীর অনুরোধে তাদের পোর্টরেট ছবি এঁকে দিয়ে  স্বল্প সময়ের মধ্যে অনেকের বেশ প্রিয়ও হয়ে উঠেছেন তিনিএই রিহার্সাল স্থলের পরিবেশটা অনেকটা ঈদের চাঁন রাতের মত আনন্দঘন অবস্থা বিরাজ করছেইতোমধ্যে আমন্ত্রিত প্রধান শিল্পীদের মধ্যে  সঙ্গীতশিল্পী তপন চৌধুরী বার্সেলোনায় অবস্থান করছেআর আমাদের সাথেই রয়েছেন পুঁথি শিল্পী কাব্য কামরুলস্থানীয় সঙ্গীত ও নৃত্য শিল্পীরা যুক্তরাজ্য থেকে আগত যন্ত্র শিল্পীদের বাদ্যযন্ত্রের সুরের তালে মহড়ায় ব্যস্তদীর্ঘ দিনের প্রস্তুতির প্রদর্শন হবে আগামীকালের প্লাসা ম্যাকবার বৈশাখী মঞ্চে,তাই স্বেচ্ছাসেবকরা তাদের সহযোগীতায় ছুটোছুটির মধ্যে আছেআয়োজক নেতৃবিন্দু অনুষ্ঠানের সার্বিক সাফল্যের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সদা কাজ করে চলেছেনরাত এগারোটার দিকে প্যারিস থেকে বিমানে উড়ে এলেন পবন দাস বাউল দম্পতিরাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহড়া স্থল বৈশাখী আয়োজনের সমস্ত প্রস্তুতির যবনিকা টানতে লাগলোএবার অথিতিদের রাত্রি যাপন রাতের খাবারের বন্দবস্থ করতে আয়োজকরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন
আমাকে এবং পবন দাস বাউল ও তার স্ত্রী মিমলু সেনকে  হোটেলে তুলে দেত্তয়ার জন্য  আয়োজক নেতৃবিন্দের একজনের সঙ্গে করে মহড়া স্থল থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হলোট্রাক্সি করে হোটেলে যাওয়ার সময় পবন দাস বাউলের সঙ্গে তার  গান,দর্শন এবং বাংলাদেশে তার গানের জনপ্রিয়তা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বেশ আলাপ জমে উঠলো২০০৬ সাল, তখন ঢাকায় ধানমন্ডিতে একটি ফ্লাটে আমরা সাত আট জন ব্যাচেলর মেছ করে থাকিমাঝে মাঝেই আমাদের মেছে রাতে বিশেষ আড্ডা জমে উঠতো,বাইরে থেকে দু একজন বন্ধু যোগ দিতো সেই আড্ডায়আমাদের সেই আড্ডায় মাঝে মাঝেই পবন দাস বাউলের ঐ সময়ের জনপ্রিয় একটি গান « বসুন্ধরার বুকে বরষারই ধারা »বেশ গাওয়া হতোভালোই লাগলো সেই গানের স্রষ্টার সাথে ক্ষণিকের সান্নিধ্য একই প্যারিস শহরে বসবাস করলেও পূর্বে তার সাথে আমার কখনো সাক্ষাৎতের সুযোগ হয়নিপবন দাস বাউল ও মিমলু সেন দম্পতিকে  হোটেলে উঠিয়ে দিয়ে এবার আমাকে রাতের খাবারের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো ভিলাদোমাত(viladomat) রোড়ে অবস্থিত পিজারিয়া বার্গার রেস্তোরায়রেস্তোরায় আসার সময় বার্সেলোনা শহরের রাতে বেশ কিছু চিত্র ধরা পড়লোমধ্যরাতের পর সাধারণত যে কোন শহর নিস্তব্ধ হয়ে যায়, বিশেষ করে প্যারিস শহর এবং এখানে সন্ধ্যে নামার সঙ্গে সঙ্গে নিস্তব্ধ নিরবতা নেমে আসে, অন্য কারো অসুবিধা অনুভব হবে ভেবে কেউ উঁচু স্বরে কথা পর্যন্ত বলেনা,রাত্রে উচ্চ শব্দের ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় আইনও রয়েছে  কিন্তু বার্সেলোনায় দেখা মিললো মধ্য রাত থেকে এই শহরের নতুন রূপে জেগে ওঠার চিত্ররাস্তার পাশের ওলিগোলীগুলোতে তরুন তরুনীদের আড্ডা ও হইহুল্লোর,রেস্তোরাগুলো জেগে আছে ভোজন রসিকদের রসনার তৃপ্তি মেটাতেঐদিন ঐ সময়ে চলছিলো এ্যাটলেতিকো মাদ্রিদ ও রিয়াল মাদ্রিদের মধ্য একটি ফুটবল ম্যাচ,ম্যাচের উত্তেজনাপূর্ণ মূহুর্তগুলোর আনন্দ উচ্ছায় বিনিময় চলছে এক ফ্লাটের  জালানা খুলে অন্য ফ্লাটের সমর্থকদের সাথেএমন ফুটবল উন্মাদনা  দেখে মনে হলো এই শহরকে ফুটবলের তীর্থ ভূমি বললে ভুল হবেনাএছাড়া বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবল ক্লাববার্সেলোনাতো এই শহরেরই অহংকারের ধন। 

রেস্তোরায় কাব্য কামরুল দম্পতি আমার জন্য অপেক্ষা করে ইতোমধ্যে খাওয়া শুরু করেদিয়েছেনতাদেরকে অতি মমতায় আতিথেয়তা করছেন পিজারিয়া বার্গার রেস্তোরার মালিক এম ডি আওয়াল ইসলাম এবং তার সহধর্মীনি জাহানারা বেগমআমিও যোগ দিলাম তাদের সাথে খাবারের মেন্যুতে রয়েছে সালচা(আলুর ফ্রাই),পিজ্জা ,মূল খাবার আমাদের দেশের খিচুরি সদৃশ পায়লা(Paella)খিচুরি ভেবেই থালা ভরে পায়লা তুলে নিলাম কিন্তু একটু ভালো ভাবে দেখে খেতে গিয়ে  হোঁচট খেলাম কারন খাবারটির মধ্যে অন্যান্য উপকরণের মধ্যে রয়েছে ঝিনুক, অক্টোপাস এবং চিংড়ি মাছফরাসিদের অতি প্রিয় খাবার ঝিনুক হলেও দীর্ঘদিন এই ভূখন্ডে বাস করেও রান্না ঝিনুকের স্বাদের সঙ্গে পরিচিত হইনি আমাদের দেশে এই খাবারটি না খাওয়ার অভ্যাসগত কারণেচিংড়ি আমার অতি প্রিয় খাবার কিন্তু ঝিনুক ও অক্টোপাসের কারণে কিছুক্ষনের জন্য  দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েগেলামএকবার ঢাকার গুলশানে একটি রেস্তোরায় অফিসিয়াল পার্টিতে কৌতুহলবসত কাঁকড়া খেতে গিয়ে পরে তা খেতে পারিনি যা আমাদের দেশের অনেক মানুষই খায়সিদ্ধান্ত নিলাম এখন থেকে বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদের সঙ্গে পরিচিত হতে হবেএই ভেবে খাওয়া শুরু করলামঝিনুক ও অক্টোপাসের স্বাদ চিংড়ি মাছ থেকে খুব একটা ব্যতিক্রম মনে হলো নাবেশ তৃপ্তিসহকারে  নিলাম বার্সেলোনার ঐতিহ্যবাহী খাবার পায়লার স্বাদ। 

খাবার পর্ব শেষ করে হোটেলে পৌছুতে প্রায় রাত দুইটা বেজে গেলোহোটেলে পৌঁছানোর সাথে সাথে অবসন্ন শরীর আর জেগে থাকার সময় দিলোনা , মুহূর্তের মধ্যে চলে গেলাম গভীর ঘুমেআমি যে হোটেলটিতে ছিলান সেটি বাংলাদেশ সমিতি বার্সেলোনার সাধারণ সম্পাদক উত্তম কুমারের মালিকানাধীন এবং তার সৌজন্যে

যে মানুষটি  খাবারের ব্যবস্থা ও রাত্রি যাপনের  স্থানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমাকে সাথে নিয়ে টিপ টিপ বৃষ্টির মধ্য সারাদিনের কর্মক্লান্ত দেহে  মধ্যরাতের বার্সেলোনা শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন তার নামসহজ প্রথমে যখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাই আপনার নাম কি ?উত্তরে, আমার নাম সহজ বলে থেমে গেলেনআমি আবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম আপনার সহজ সেই নামটি কি ?উনি বললেন আমার নামই সহজতখন বুজলাম কোন মানুষের নাম সহজও হতে পারেতবে মাদারীপুরের সহজ ভাইয়ের সঙ্গে যতটুকু মেশার সুযোগ হয়েছে তাতে তাকে একটুও জটিল মনে হয়নি,তার নামের মতই স্বভাবেও খুবই সহজ , বন্ধুসুলভ এবং অতিথিপরায়ণ মানুষ মনে হয়েছে  


বিডি নিউজ২৪.কম ব্লগ থেকে  ছবি দেখে পড়তে নিচের লিঙ্কগুলোতে ক্লিক করুন:
১.বৈশাখের আমন্ত্রণে কাতালোনিয়ার রাজধানী বার্সেলোনা ঘুরে এসে (পর্ব-১) পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
২.বৈশাখের আমন্ত্রণে কাতালোনিয়ার রাজধানী বার্সেলোনা ঘুরে এসে (পর্ব-২) পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
৩.বৈশাখের আমন্ত্রণে কাতালোনিয়ার রাজধানী বার্সেলোনা ঘুরে এসে (পর্ব-৩) পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
৪.বৈশাখের আমন্ত্রণে কাতালোনিয়ার রাজধানী বার্সেলোনা ঘুরে এসে (পর্ব-৪)পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
৫.বৈশাখের আমন্ত্রণে কাতালোনিয়ার রাজধানী বার্সেলোনা ঘুরে এসে (পর্ব-৫) পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
৬.বৈশাখের আমন্ত্রণে কাতালোনিয়ার রাজধানী বার্সেলোনা ঘুরে এসে। (শেষ পর্ব)পড়তে এখানে ক্লিক করুন