শুক্রবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০১৭

উন্নয়ন সরকার বনাম রামপাল আন্দোলন

বাংলাদেশের মানুষ এখন এমন এক উন্নয়ন সরকারের অধীনে জীবন যাপন করছে যে, জনগণ উন্নয়ন না চাইলেও সরকার জোর করে দেশ ও জনগণের  উন্নয়ন করতে   ব্যতিব্যস্ত । উন্নয়ন হলে জনগণের খুশী হওয়ার কথা ,কারণ দেশের উন্নয়ন সাথে মানুষের জীবন যাপনের মানোন্নয়নের সম্পর্ক। তবু দেশের বৃহৎ একটা অংশ এমন উন্নয়ন চাচ্ছে না বরং বিরোধিতা করে রাস্তায় নেমেছে। এই বৃহৎ অংশ আবার অন্ধ বিশ্বাসী মানুষ নয়, কারও আনুগত্য বা দালালী  করে অর্থ বিত্ত বানানোর মানুষিকতা সম্পন্ন নয়, এরা যুক্তিবাদী, বিজ্ঞান মনস্ক, সচেতন এবং ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানবতাবাদী মানুষদের অংশ। এদের ডাকে সাড়া দিয়ে জেগে উঠে রাস্তায় নেমেছে  দেশের বৃহৎ তরুণ প্রজন্ম। যে প্রজন্ম কোন টেণ্ডার পাওয়া, বা মিছিল শেষে খিচুড়ি খাওয়ার আশায় এই ডাকে সাড়া দেননি কিংবা ভবিষ্যতে কোন মন্ত্রী,  এম পি হওয়ার পথকে সুগম করার জন্যও সাড়া দেননি। তারা উপলব্ধি ও যুক্তির নিরিখে বুঝতে পেরেছেন সুন্দরবনের নিকটবর্তী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপিত হলে জীব বৈচিত্র্যে ভরপুর ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন হুমকির সম্মুখীন হবে।একজন ব্যক্তির গোঁয়ারতুমিতে  এই বন ধ্বংস হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অভাবনীয় প্রাকৃতিক বিপর্যয় সহ নানামুখী সমস্যার  সম্মুখীন হবে, এই চেতনার জায়গা থেকেই নিজের পকেটের পয়সা ও সময় ব্যয় করে  তারা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে। তাদের আন্দোলন ভাষা ও প্রতিবাদের মাধ্যমগুলো সভ্য,মার্জিত,সুশৃঙ্খল এবং সৃজনশীল। তবুও কেন সরকার একবারের জন্যও এই মানুষগুলোর কথা শোনার প্রয়োজন অনুভব করছে না?
এখানে বুঝতে হবে,  আমরা সাধারণ দৃষ্টিতে উন্নয়ন বলতে যা দেখি বা বুঝি,ক্ষমতাসীনরাও কি একই ভাবে বোঝে? পার্থক্যের বিস্তর ফারাক এখানেই। আমরা উন্নয়ন বলতে সাধারণ মানুষের স্বার্থকে বুঝি। আর ক্ষমতাসীনদের উন্নয়ন হল প্রকল্প বরাদ্দের নামে  কিছু মানুষের মধ্যে  অর্থ ভাগবাটোয়ারা করে বিদেশে পাচার করা। এই জায়গায় বাধা এলে কে ছেড়ে দ্যায়। প্রজাতন্ত্রের সকল শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা তাদের হাতে। প্রয়োজন হলে প্রজাতন্ত্রের বৈধ শক্তিকে অবৈধ ব্যবহার করে হলেও নিজ স্বার্থ উদ্ধার করবে।অবৈধ ও স্বার্থান্বেষীদের চরিত্র এমনই হয়ে থাকে। 
বর্তমান চলমান আন্দোলনকারীদের সাথে আজকের দানবীয় সরকারের মূল দ্বন্দ্ব এখানেই।  

তবে  যুদ্ধাপরাধীর বিচারের ইস্যুতে যে তরুণ প্রজন্মের সমর্থনে আজকের সরকারের  এই দানবীয় রূপ, সেই তরুণ প্রজন্মই জাতিয় স্বার্থে ঘুরে দাঁড়িয়েছে আপনাদের বিপক্ষে, সুতরাং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থার আশীর্বাদে স্থিতিশীল হওয়ার সুবাদে এই উপলব্ধি আজ না হলেও, বাস্তবতা দিয়ে সেই উপলব্ধি করার সময় শুধুই  সময়ের ব্যাপার মাত্র ......।

বুধবার, ৪ জানুয়ারী, ২০১৭

শিক্ষা নিয়ে গড়বো দেশ , শেখ হাসিনার বাংলাদেশ

এবার বাংলাদেশের প্রাথমিক পাঠ্যবই এর মলাটের পেছনে সংযোজিত নতুন দু’লাইনের একটি স্লোগান দেশের বর্তমান প্রকৃত বাস্তবতার ইঙ্গিত ও অনেকগুলো ভাবনার জন্ম দিলো। শ্লোগানটি হল-

শিক্ষা নিয়ে গড়বো দেশ
শেখ হাসিনার বাংলাদেশ।
শ্লোগানটি মূলত হওয়া উচিত ছিলো-
শিক্ষা নিয়ে গড়বো দেশ
আমার এই বাংলাদেশ।
এমন হলে একটি শিশু ভাবতে শিখতো এই দেশ ও এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠী আমার, তাই আমাকে এই রাষ্ট্র ও এই জনগোষ্ঠীকে সঠিকরূপে পরিচালনার জন্য জ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা অর্জন করতে হবে এবং নিজেকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এমন হলে শিশুর মনের মধ্যে তৈরি হতো নেতৃত্ব দানের মানসিকতা।
অথবা শ্লোগানটি যদি এমন হতো-
শিক্ষা নিয়ে গড়বো দেশ
আমাদের এই বাংলাদেশ।
তাহলে একটি শিশুর মধ্যে গড়ে উঠত সামগ্রিক জাতিকে নিয়ে ভাবনার মানসিকতা এবং মনের মধ্যে উদয় হতো- সম্মিলিত চেষ্টা ও অবদানেই গড়ে তোলা সম্ভব সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। আর সেই অবদানে নিজেকে একজন যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে তাকে জ্ঞান অর্জন অত্যাবশ্যক।
আজকের শিশু মূলত আগামী দিনের দেশের কর্ণধার এবং দেশ গড়ার কারিগর। একটি শিশু যে দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার এবং তার হাতেই রাষ্ট্রের আগামী দিনের দায়িত্ব এই বোধটা শিশুদের মধ্যে তৈরি করে দেয়ার মহান দায়িত্ব মূলত রাষ্ট্রের এবং তা রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থেই।
কিন্তু আজ যে স্লোগানটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে, এই স্লোগানটির মাধ্যমে প্রথমেই একটি শিশুর মনে যে ধারণা বা বোধের জন্ম দেবে তা হলো, পড়তে হবে দেশ গড়ার জন্য কিন্তু পড়াশুনা করে যে দেশটি গড়ার দায়িত্ব তাকে নিতে হবে সেই দেশটি তার নয়, দেশটি একজন ব্যক্তি বিশেষের। পড়াশুনা করে মূলত তাকে এই দেশ গড়ার জন্য একজন দক্ষ কর্মচারী হতে হবে, নেতা হওয়া যাবেনা, কারণ দেশের নেতৃত্ব আসবে দেশের মালিকের উত্তরসূরিদের থেকে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণ ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ের জন্য কোন ব্যক্তি বিশেষকে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব প্রদান করে থাকেন। জনগণ মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নেতা নির্বাচন করেন, তাকে রাষ্ট্রের মালিকানা প্রদান করেন না। কিন্তু এবারের প্রাথমিক শিক্ষার বইয়ের মলাটের শ্লোগানের সারমর্ম বলে দিচ্ছে, আমাদের দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নয় বরং রাষ্ট্রের মালিকানা সত্ত্ব অর্জন করেছেন। এমন স্লোগানের যৌক্তিকতায় বলা যেতে পারে, যেহেতু আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে জনগণ দায়িত্ব দেননি, দায়িত্ব তিনি নিজে নিয়েছেন এবং তা অপকৌশলের আশ্রয় নিয়ে। পৃথিবীর সমস্ত অবৈধ ক্ষমতাধারীরা সব সময়য় নিজেদের কে রাষ্ট্রের মালিক বা অধিপতি ভাবেন আর জনগণকে তার দাস মনে করেন। আর রাষ্ট্র শক্তির অপব্যবহার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে যাবতীয় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে থাকেন। যা ঐতিহাসিক সত্য। তার বহিঃপ্রকাশ আমরা বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে লক্ষ্য করছি।

দেশটা যে দীর্ঘ মেয়াদি স্বৈরশাসনের কব্জায় পড়েছে তারই সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে বইয়ের মলাটের দুই লাইনের স্লোগানে। একটি শিশুর জীবনের সমাজ নিয়ে ভাবনার প্রথম ধাপেই তার মস্তিষ্কে মধ্যে পরাধীনতার বীজ ঢুকিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, এর ফলে শিশুর মনে অঙ্কুরিত হবে দাস প্রবৃত্তির মানসিকতা, ভবিষ্যতের বেড়ে ওঠা মানুষটির মধ্যে তৈরি হবেনা প্রতিবাদের মানসিকতা, তৈরি হবে বিশেষ কোন মানুষ বা গোষ্ঠীর প্রতি অন্ধ আনুগত্য ও মাথানত করার প্রবৃত্তি।
সাধারণত উন্নত চিন্তাশীল দেশগুলোতে দেখা যায়, যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে দেশ ও জনগণের কল্যাণে ও বৃহত্তর স্বার্থে কোন বিশেষ অবদান রেখে যান তাহলে তাদের দায়িত্ব থেকে বিদায়ের পর পরবর্তী প্রজন্ম অথবা পরবর্তীতে রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিবর্গ তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ নানাভাবে সম্মান প্রদর্শন করেন। অথচ আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে বৃহত্তর জনগণের শ্রদ্ধা বা অশ্রদ্ধা প্রদর্শনকে উপেক্ষা করে ক্ষমতার অপব্যবহার মাধ্যমে আইন করে নিজের জীবদ্দশায় নিজের স্বীকৃতি নিজেই ঘোষণা করে মানসিক আত্মতৃপ্তি লাভ করার সংস্কৃতি। যা হাস্যকর ও রাষ্ট্রের জন্য অকল্যাণকর।